পেঁয়াজের দামে আগুন: এক সপ্তাহেই কেজিতে ৪০ টাকা বেড়েছে

0

পাবনায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের কেজি ৬০-৭০ টাকা থেকে বেড়ে ১০৫-১১০ টাকায় পৌঁছেছে। বিক্রেতাদের দাবি, সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে; তবে ক্রেতাদের অভিযোগ-মজুদদার সিন্ডিকেটের কারসাজিতেই এই মূল্যবৃদ্ধি। ফলে সাধারণ মানুষ পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
পেঁয়াজের বাজারে আগুন, দাম বাড়ায় বিপাকে সাধারণ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক, পাবনা।।
দেশের অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদন অঞ্চল পাবনায় হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে পেঁয়াজের দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি ৬০-৭০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৫-১১০ টাকায়। এভাবে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ৩৫-৪০ টাকা বৃদ্ধি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। বাজারে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে দিশেহারা ক্রেতারা বলছেন, এখন আর সবজির ঝোলেও পেঁয়াজ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাবনা শহরের রাধানগর, চারমাথা ও হেমায়েতপুর বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকায়। আর আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ৯৫ টাকায়। অথচ গত সপ্তাহেও একই পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬৫-৭০ টাকায়। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই বলছেন, উৎপাদন মৌসুম শেষের দিকে হওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে, ফলে বাজারে পেঁয়াজের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বিক্রেতারা দাবি করছেন, কৃষকের ঘরে এখন পেঁয়াজের মজুদ প্রায় শেষ। নতুন ফসল আসতে আরও দেড়-দুই মাস সময় লাগবে। ফলে পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। তবে অনেক ক্রেতা এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, “সরবরাহ কিছুটা কমলেও এত দ্রুত ৪০ টাকা বেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক। এর পেছনে নিশ্চয়ই ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট কাজ করছে।”

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে তারা কেজিপ্রতি ২৫-৩০ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন। এখন যখন দাম বেড়েছে, তখন তাদের ঘরে পণ্য নেই। কৃষকরা লাভবান না হয়ে উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে, পাইকার ও বড় ব্যবসায়ীরা আগেই পেঁয়াজ মজুদ করে রেখে এখন উচ্চ দামে বিক্রি করছেন। এতে একদিকে কৃষক যেমন বঞ্চিত, তেমনি ক্রেতাও দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার জেলায় পেঁয়াজের চাষ কিছুটা কম হয়েছে। একদিকে আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় ফলন কম, অন্যদিকে আগের মৌসুমে দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষক বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকেছেন। ফলে বাজারে সরবরাহে প্রভাব পড়েছে। তবে তারা আশা করছেন, আগাম মৌসুমের পেঁয়াজ বাজারে এলে দাম কিছুটা কমে আসবে।

বাজারে শীতকালীন সবজির দামেও ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। শিম, বেগুন, ফুলকপি, আলু-সবকিছুর দাম বাড়তি। ফলে সাধারণ মানুষের বাজার ব্যয় আরও বেড়ে গেছে। একজন ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সবজির বাজারে ঢুকলেই এখন আতঙ্ক লাগে। আলু ৫০, বেগুন ৮০, পেঁয়াজ ১১০ টাকা কেজি-এই দামে পরিবার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।”

অন্যদিকে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরবরাহ-হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ-অভাবই মূল সমস্যা। দেশে পেঁয়াজের চাহিদা যত, সেই অনুযায়ী সংরক্ষণ-ব্যবস্থা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এখনো পর্যাপ্ত নয়। বছরের মাঝামাঝি সময়ে যখন দাম কম থাকে, তখন কার্যকর সরকারি সংরক্ষণ ও মজুদনীতি থাকলে এই ধরনের আকস্মিক দামের উত্থান অনেকাংশে রোধ করা যেত।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজারে নজরদারি বাড়ানো হবে। পাইকারি বাজারে কেউ অযৌক্তিকভাবে পেঁয়াজ মজুদ করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা ক্রেতাদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন-যাতে কেউ পণ্য সংকটের গুজব ছড়িয়ে বাজার অস্থির না করতে পারে।

বর্তমানে ভোক্তা, কৃষক ও ব্যবসায়ী-সব পক্ষেরই নজর একই দিকে: নতুন মৌসুমের পেঁয়াজ কখন বাজারে আসবে। সবাই আশা করছে, ডিসেম্বরের শুরুতে নতুন পেঁয়াজ আসলে বাজারে স্থিতি ফিরবে এবং সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাবে।

এই প্রতিবেদনটি কেবল স্থানীয় বাজারের চিত্র নয়, বরং জাতীয় নিত্যপণ্য সরবরাহ চেইনেরও বাস্তব প্রতিফলন। উৎপাদন কমে যাওয়া, সংরক্ষণের অপ্রতুলতা, ও ব্যবসায়িক মনোপলি-এই তিনটি উপাদানই বারবার দেশের পেঁয়াজবাজারকে অস্থির করে তুলছে। এবারও তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তাই শুধু অভিযানে নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা-যেখানে কৃষক, ব্যবসায়ী ও প্রশাসন একই ছাতার নিচে কাজ করবে, যাতে দেশের মানুষ প্রতি বছর পেঁয়াজের দামের আগুনে না পোড়ে।

Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)