চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ গু/লিবিদ্ধ, চিহ্নিত সন্ত্রা/সী বাবলা নি/হত

0

চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-পাঁচলাইশ আংশিক) আসনে বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী জনসংযোগে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন চট্টগ্রামের চিহ্নিত সন্ত্রাসী সারোয়ার হোসেন বাবলা (৩৮)।
নির্বাচনী প্রচারণায় রক্তাক্ত হামলা: চট্টগ্রামে এরশাদ উল্লাহ আহত, হোসেন বাবলার মৃত্যু

বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম।।

চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-পাঁচলাইশ আংশিক) আসনে বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী জনসংযোগে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন চট্টগ্রামের চিহ্নিত সন্ত্রাসী সারোয়ার হোসেন বাবলা (৩৮)।
বুধবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে নগরীর পাঁচলাইশ থানার চালিতাতলী বাজার এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, বর্তমানে সেখানে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে।


ঘটনার বিস্তারিত

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, বিকেল ৪টার দিকে বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ তাঁর কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে চালিতাতলী বাজার এলাকায় নির্বাচনী জনসংযোগে নামেন। ঠিক সে সময়ই হঠাৎ কয়েকজন অজ্ঞাত সশস্ত্র দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে করে এসে তাঁর দিকেই লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে।

গুলিতে এরশাদ উল্লাহর ডান পায়ে ও পাশে থাকা সারোয়ার হোসেন বাবলার বুকে গুলি লাগে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতা ও দলের নেতাকর্মীরা দ্রুত দুজনকে উদ্ধার করে নগরীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক সারোয়ার হোসেন বাবলাকে মৃত ঘোষণা করেন।

গুলিবিদ্ধ এরশাদ উল্লাহ বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, তাঁর অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল ও আশঙ্কামুক্ত। তিনি হাসপাতালের সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন।


পুলিশের প্রাথমিক ধারণা: পরিকল্পিত হামলা

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) শাহাবুদ্দিন কোরেশী সাংবাদিকদের জানান, এটি একটি “পরিকল্পিত হামলা” হতে পারে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।
তিনি বলেন, “ঘটনাস্থল থেকে একাধিক গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। কারা কী উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়েছে তা উদঘাটনে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। হামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ-দুটি দিকই তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।”


কে ছিলেন নিহত সারোয়ার হোসেন বাবলা

নিহত সারোয়ার হোসেন বাবলা চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের বহুল পরিচিত নাম। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নগরের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায় জড়িত ছিলেন বলে পুলিশের একাধিক সূত্রে জানা গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে অন্তত ১৯টি মামলা রয়েছে।

বাবলা ছিলেন আলোচিত “আট ছাত্রলীগ নেতা খুন মামলার” অন্যতম আসামি সাজ্জাদ হোসেন খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তবে পরবর্তীতে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে বাবলা নিজস্ব একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ গড়ে তোলেন।
২০১১ সালের জুলাই মাসে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন বাবলা ও তাঁর সহযোগী নুরুন্নবী ম্যাক্সন। সে সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল একটি একে-৪৭ রাইফেল, দুটি পিস্তল, একটি এলজি ও বিপুল পরিমাণ গুলি।

২০১৭ সালে জামিনে ছাড়া পেয়ে কাতারে চলে যান বাবলা। প্রবাসে থেকেও তিনি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতেন বলে অভিযোগ ওঠে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাতারে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি আবারও পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।

এ বছরের ২৭ জুলাই রাতেও চান্দগাঁও থানা পুলিশ নগরের অনন্যা আবাসিক এলাকা থেকে তাঁকে সহযোগী বাবুলসহ গ্রেপ্তার করে। পরে আদালত তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠান। যদিও জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি সম্প্রতি আবার এলাকায় সক্রিয় হন।


পুরনো বিরোধ নাকি নির্বাচনী উত্তেজনা?

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও নির্বাচনী মাঠ দখলকে কেন্দ্র করেই এই সংঘর্ষ ও হামলার সূত্রপাত হতে পারে।
পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম বলেন,
“নিহত বাবলা একজন চিহ্নিত অস্ত্রধারী ও একাধিক মামলার আসামি। প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, এটি পুরনো বিরোধ বা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার জের ধরে ঘটেছে। তদন্তের পর বিষয়টি পরিষ্কার হবে।”

তিনি আরও জানান, হামলার পরপরই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ টহল জোরদার করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের সহিংসতা না ছড়ায়।


বিএনপি’র অভিযোগ: ‘প্রার্থীর ওপর পরিকল্পিত হামলা’

বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নূরুল আমিন বলেন,
“এটি আমাদের প্রার্থীর ওপর পরিকল্পিত হামলা। সাবেক স্বৈরাচারী দলের সমর্থিত সন্ত্রাসীরা আমাদের জনসংযোগে গুলি চালিয়েছে। এতে আমাদের প্রার্থী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং একজন নিহত হয়েছেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও হামলাকারীরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে গেছে।”

তিনি দাবি করেন, নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি প্রার্থীদের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলার ঘটনা ঘটছে, অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
“এভাবে যদি নির্বাচনী সহিংসতা চলতে থাকে, তাহলে ভোটের পরিবেশই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে,” যোগ করেন নূরুল আমিন।


এলাকাজুড়ে উত্তেজনা, নিরাপত্তা জোরদার

গুলিবর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর থেকে চালিতাতলী ও আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা আতঙ্কে দোকানপাট বন্ধ করে দেয়, রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় কিছু সময়ের জন্য।
পুলিশ ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলে তদন্ত শুরু করে এবং অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়। বর্তমানে পুরো এলাকায় র‍্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি) ও সিএমপি’র টিম টহল দিচ্ছে।

পাঁচলাইশ থানা ও সিএমপি সূত্রে জানা গেছে, হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও হামলাকারীদের চলাচল শনাক্তে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে।


জনমনে উদ্বেগ: নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কা

চট্টগ্রামের রাজনীতিক মহলে এই হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে এ ধরনের হামলা একটি অশুভ বার্তা দিচ্ছে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রামে নির্বাচনী সহিংসতার নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।


চট্টগ্রাম-৮ আসনে গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির এই ঘটনা এখন পুরো নগরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
বিএনপি ও স্থানীয় প্রশাসনের তদন্তের দিকেই এখন সবার নজর-এই হামলার পেছনে আসল উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনাকারীরা কারা, তা জানতেই অপেক্ষা চট্টগ্রামবাসীর।

Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)