দক্ষিণাঞ্চলের আলোচিত আসন বরিশাল-৬: কার ভাগ্যে জুটবে জয়মাল্য

0
বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে ত্রিমুখী লড়াই: ধানের শীষ, দাড়িপাল্লা নাকি হাতপাখা

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

দেশজুড়ে নির্বাচনী উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৫ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন রাজনীতির মাঠে বইছে নির্বাচনের বাতাস। বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো একে একে প্রকাশ করছে তাদের মনোনীত প্রার্থীদের নাম, আর তাতে যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ময়দান। কোথাও উৎসবমুখর পরিবেশ, কোথাও মনোনয়ন বঞ্চিতদের ক্ষোভের আগুন-সবমিলিয়ে দেশজুড়ে চলছে এক অঘোষিত নির্বাচনী প্রতিযোগিতা।

বিএনপির মনোনয়ন ঘোষণা ও দেশের রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া

গত (৩ নভেম্বর) রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন ২৩৭টি আসনে দলের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীদের নাম। ঘোষণার পরপরই বিএনপির বিভিন্ন শাখা সংগঠন ও জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দেয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। দীর্ঘদিন পর জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি, বিশেষ করে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনের পর এই ঘোষণা নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

তবে অন্যদিকে, মনোনয়ন না পাওয়া নেতাদের অনুসারীরা কিছু এলাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কোথাও প্রতিবাদ মিছিল, কোথাও দলীয় কার্যালয় ঘেরাও, এমনকি কিছু এলাকায় সড়ক অবরোধ কর্মসূচির খবরও পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ, তবে শেষ পর্যন্ত সবাই দলের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন তারা।

বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ): দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আসন

দক্ষিণাঞ্চলের রাজনীতিতে বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনটি সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ইতিহাস, ভূগোল ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই আসনটির গুরুত্ব অপরিসীম। আয়তনের দিক থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা বাকেরগঞ্জের আয়তন ৪১২.৯৯ বর্গকিলোমিটার। এখানে মোট ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে।

২০২৫ সালের নির্বাচনে এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩,৫৬,০৯২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,৭৩,০৯৬ জন এবং মহিলা ভোটার ১,৮২,৯৭৭ জন। ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৯৪টি। ফলে নির্বাচনকালীন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের কৌশলগত ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ আসনে পূর্বে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই পালাক্রমে জয়লাভ করেছে। তবে এবার আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা না করলেও বাকেরগঞ্জে বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীদের নাম ইতোমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে।

তিন দলের তিন প্রতিদ্বন্দ্বী: কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে?

১। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বরিশাল জেলা দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক, সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খান। তিনি এলাকায় একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি এ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি সংগঠনটি পুনরায় সক্রিয় হয়েছে, বিশেষত ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একত্রিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

২। বাংলাদেশ জামাতে ইসলামী
দাড়িপাল্লা প্রতীকে লড়ছেন বরিশাল জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক মাহমুদুন নবী তালুকদার। তিনি একজন শিক্ষিত, পরিমিত ও ধার্মিক রাজনীতিক হিসেবে এলাকায় সুনাম অর্জন করেছেন। ইসলামী শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি যুবসমাজের একটি অংশকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর মূল শক্তি সংগঠনের নিবেদিতপ্রাণ ক্যাডারভিত্তিক কাঠামো এবং ধর্মীয় ভোটারদের একাংশের অটল সমর্থন।

৩। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
হাতপাখা প্রতীকে লড়বেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর ও চরমোনাই পীর পরিবারের শায়খে চরমোনাই মুফতী ফয়জুল করীম। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। শুধু বরিশাল নয়, সারাদেশেই তাঁর অনুসারী রয়েছে বিপুলসংখ্যক। যদি তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় সরাসরি মাঠে সক্রিয় থাকেন, তবে ধর্মভিত্তিক ভোটের বড় অংশ তাঁর দিকে ঝুঁকতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নির্বাচনী মাঠে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়

গ্রামীণ জনপদে এখন প্রতিদিনই নির্বাচন নিয়ে আলোচনা। চায়ের দোকান, হাটবাজার, মসজিদের বারান্দা কিংবা সন্ধ্যার আড্ডায় এখন একটাই আলোচ্য বিষয়-কে হবে বাকেরগঞ্জের এমপি? কেউ বলছেন, সাবেক এমপি আবুল হোসেন খানের অভিজ্ঞতা ও জনপ্রিয়তার কাছে কেউ টিকবে না। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন ইসলামপন্থী ভোট ভাগ না হলে জামায়াত বা ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী বড় চমক দেখাতে পারেন।

বাকেরগঞ্জ পৌর এলাকার ব্যবসায়ী নুরুল আমিন বলেন, “এলাকার মানুষ এবার সুষ্ঠু ভোট চায়। কে জিতবে সেটা দেখার বিষয়, তবে সবাই চায় শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।”

একইভাবে সাতুরিয়া ইউনিয়নের কৃষক রহিম হাওলাদার বলেন, “বিএনপি নেতা আবুল হোসেন খান এলাকায় অনেক কাজ করেছেন, তবে ধর্মীয় ভোটও এবার শক্তিশালী। দেখা যাক কার ভাগ্য খোলে।”

রাজনৈতিক সমীকরণ: সম্ভাব্য লড়াই তিন কোণে

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যদি জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন আলাদাভাবে নির্বাচন করে, তাহলে ভোট বিভাজনের কারণে বিএনপির প্রার্থী সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন। কিন্তু যদি ইসলামপন্থী দুই দল একে অপরের সঙ্গে সমঝোতায় আসে এবং একক প্রার্থী দেয়, তবে ফলাফল অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

এছাড়া, বিএনপি যদি মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করতে পারে এবং প্রার্থীকে কেন্দ্র করে ঐক্য বজায় রাখে, তবে তাদের জয়ের সম্ভাবনা আরও বাড়বে। তবে সবকিছু নির্ভর করবে নির্বাচনের পরিবেশ ও ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ থাকে তার ওপর।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন,

“বাকেরগঞ্জ সবসময়ই দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন। যদি নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তাহলে এই আসনে চমকপ্রদ ফলাফল আসার সম্ভাবনা প্রবল।”

নির্বাচনী আমেজ : মাঠে এখন সরব প্রচার, সামাজিক মাধ্যমে ঝড়

নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাকেরগঞ্জের রাজনৈতিক আবহ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এখন থেকেই দলীয় কার্যালয়ে ব্যানার-পোস্টার টানানো শুরু হয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে মাইকিং, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, পথসভা, উঠান বৈঠক-সবকিছু যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে এক উত্তেজনাপূর্ণ নির্বাচনের।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে প্রচারণার ঢেউ। প্রার্থীদের সমর্থকরা ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে প্রচারণামূলক ভিডিও, পোস্টার ও বক্তব্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কেউ অতীত উন্নয়নচিত্র তুলে ধরছেন, কেউ বা প্রতিপক্ষের সমালোচনায় মুখর।

ভোটারদের প্রত্যাশা : উন্নয়ন, শান্তি ও স্বচ্ছ নেতৃত্ব

বাকেরগঞ্জের সাধারণ ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় ইস্যু হলো-উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অবকাঠামো। উপজেলার বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষি নির্ভর অর্থনীতি এবং নদীভাঙন সমস্যা সমাধান-এসবই এখন ভোটারদের আলোচনায়।

শিক্ষক আজিজুল হক বলেন, “আমরা এমন একজন জনপ্রতিনিধি চাই, যিনি কথার ফুলঝুড়ি নয়, বাস্তবে এলাকার উন্নয়ন করবেন।”
অন্যদিকে, তরুণ ভোটাররা বলছেন, তারা এবার এমন প্রার্থীকে বেছে নিতে চান যিনি স্বচ্ছ, প্রযুক্তিবান্ধব এবং তরুণদের কর্মসংস্থানে মনোযোগী হবেন।

সব শেষে বলা যায়...

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসন এখন দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে আলোচিত আসনগুলোর একটি। মাঠে তিন শক্তিধর প্রার্থী, ভোটারদের মধ্যে বাড়ছে আগ্রহ, রাজনৈতিক দলগুলোও সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে মাঠে নামছে।
সবশেষে একটাই প্রশ্ন-
কে জিতবে বাকেরগঞ্জে? ধানের শীষ, দাড়িপাল্লা না হাতপাখা?
উত্তর মিলবে ভোটের দিনই, তবে আপাতত গ্রামীণ আড্ডা থেকে শহরের চায়ের কাপে পর্যন্ত একটাই আলোচনার বিষয়-
“বাকেরগঞ্জে এবার হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।”

Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)