চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছেন বীর প্রতীক রতন আলী শরীফ
রাষ্ট্রীয় খেতাবপ্রাপ্ত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে নয়, ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে যাঁর রাষ্ট্রীয় সম্মান ও সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা পাওয়ার কথা ছিল-তাঁকেই মৃত্যুর আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসপাতালের ভিআইপি কেবিনে পড়ে থাকতে হয়েছে চিকিৎসক ছাড়াই। বাবুগঞ্জ উপজেলার সূর্যসন্তান, বীর প্রতীক রতন আলী শরীফের মৃত্যু তাই আর পাঁচটি মৃত্যুর মতো নয়; এটি রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক ভয়াবহ ব্যর্থতার নাম।
বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভিআইপি কেবিনে ভর্তি থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বীর মুক্তিযোদ্ধা রতন আলী শরীফের ক্ষেত্রে। পরিবারের অভিযোগ, বারবার ডাকলেও কোনো দায়িত্বশীল চিকিৎসক তাঁর কাছে যাননি। এই মৃত্যু নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে-রাষ্ট্র কি তার বীরদের শুধু পদক দেয়, নাকি দায়িত্বও নেয়?
একজন বীর, একটি মৃত্যু, অসংখ্য প্রশ্ন
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় নয়; এটি রক্তে লেখা ইতিহাস। সেই ইতিহাসের একজন সক্রিয় যোদ্ধা ছিলেন বীর প্রতীক রতন আলী শরীফ। যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন বাজি রেখে লড়াই করা এই মানুষটি স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর নিজের দেশের একটি সরকারি হাসপাতালে ন্যূনতম চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাবেন-এটি কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি জাতীয় লজ্জা।
ভিআইপি কেবিন: নামেই ভিআইপি, বাস্তবে শূন্যতা
বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিআইপি কেবিনে তাঁকে রাখা হয়েছিল-এ তথ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও অস্বীকার করে না। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, কেবিন থাকলেও চিকিৎসা ছিল না। চিকিৎসক রাউন্ড, পর্যবেক্ষণ, জরুরি সাড়া-কিছুই কার্যকরভাবে হয়নি। ভিআইপি কেবিন যেন হয়ে উঠেছিল নিঃসঙ্গ মৃত্যুর কক্ষ।
‘ডাক্তার ডাকছি’-কিন্তু ডাক্তার আসেননি
পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁরা বারবার চিকিৎসকদের জানান, নার্সদের অনুরোধ করেন। কিন্তু দিনের পর দিন কোনো সিনিয়র চিকিৎসক রোগীর কাছে যাননি। এই অভিযোগ শুধু আবেগ নয়; এটি একটি গুরুতর প্রশাসনিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা অধিকার: কাগজে আছে, বাস্তবে কোথায়?
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় স্পষ্ট-মুক্তিযোদ্ধারা সরকারি হাসপাতালে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য নেই কোনো আলাদা মনিটরিং সেল, নেই দায় নির্ধারণের সুস্পষ্ট কাঠামো।
শেবাচিমের দীর্ঘদিনের সংকট
বরিশাল শেবাচিম দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র। অথচ চিকিৎসক সংকট, রোগী-চিকিৎসক অনুপাতের ভয়াবহতা, দায়িত্বহীনতা-এসব অভিযোগ নতুন নয়। এই কাঠামোগত দুর্বলতার সবচেয়ে নির্মম শিকার হলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
এটি কি ব্যক্তিগত অবহেলা, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ?
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও আইনবিদদের মতে, এটি নিছক একজন চিকিৎসকের গাফিলতি নয়। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, যেখানে দায়িত্ব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় শেষ পর্যন্ত দায় নেন কেউই না।
‘ভিআইপি’? না’কি সংস্কৃতির ভণ্ডামি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে ভিআইপি ব্যবস্থাপনা আসলে একটি ভিজ্যুয়াল বিভ্রম। আলাদা কক্ষ থাকলেও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় আলাদা কোনো কাঠামো নেই। ফলে ভিআইপি কেবিনও অবহেলার বাইরে নয়।
একধিক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ক্ষোভ
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও সামাজিক সংগঠনগুলো বলছে-এই মৃত্যু গোটা মুক্তিযোদ্ধা সমাজকে অপমান করেছে। প্রশ্ন উঠছে, যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলেও কি জীবনের শেষ সময়ে চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই?
আইনের চোখে এই মৃত্যু কেমন?
আইন অনুযায়ী, চিকিৎসা অবহেলার ফলে মৃত্যু হলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে চিকিৎসা অবহেলার মামলায় বিচার ও শাস্তির নজির খুবই কম।
তদন্ত হবে তো? নাকি নথি চাপা পড়বে?
অভিজ্ঞতা বলছে, এমন ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফল প্রকাশ পায় না। দায়ীরা থেকে যায় আড়ালে, আর পরিবার পায় শুধু শোক।
নাগরিক দৃষ্টিভঙ্গি: রাষ্ট্র কি দায় নেবে?
বীর প্রতীক রতন আলী শরীফের মৃত্যু রাষ্ট্রকে আয়নায় দাঁড় করিয়েছে। বীরদের সম্মান যদি সত্যিই আন্তরিক হয়, তবে তা হাসপাতালের ওয়ার্ডে প্রমাণ করতে হবে।
একটি মৃত্যুর দায়, একটি জাতির শিক্ষা
এই মৃত্যু যদি প্রশ্ন তোলে, যদি পরিবর্তনের দাবি জাগায়-তবেই রতন আলী শরীফের আত্মত্যাগ কিছুটা হলেও মর্যাদা পাবে। নইলে এটি হবে আরেকটি ফাইলবন্দি মৃত্যুর গল্প।
সব শেষে বলা যায়
বীর প্রতীক রতন আলী শরীফের মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায়ীদের বিচার না হলে, এই দায় রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।