![]() |
| কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা: যেভাবে বিশ্ব জানল বাংলাদেশের জন্ম |
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে চট্টগ্রামের নাম উচ্চারিত হলেই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের কথা আসে। কারণ এই কেন্দ্র থেকেই ২৬ ও ২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রথম প্রচারিত হয়। ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর অভিযান শুরু হওয়ার পর তৈরি হওয়া ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার মধ্যেও এই বেতার কেন্দ্রটিই সারাদেশে আশা ও প্রতিরোধের নতুন সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলে। স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুর দিকে বিভ্রান্তি দূর করে জনগণকে দেশরক্ষার আহ্বান জানানোর ক্ষেত্রে কালুরঘাটের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক এবং সিদ্ধান্তমূলক।
২৫ মার্চ রাতের অন্ধকার ঢাকা শহরে ছিল মৃত্যুর মিছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সীমাহীন নৃশংসতায় সাধারণ মানুষ, ছাত্র, পুলিশ, ইপিআর সদস্যদের ওপর হামলে পড়ে। সেই দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঠিক রাত ১২টা ২০ মিনিটে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং জাতিকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আহ্বান জানান। পরে এই ঘোষণাটি ওয়ারলেসের মাধ্যমে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। ড. মযহারুল ইসলামের উল্লেখ অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধুর ডিক্টেশনে জেনারেল ওসমানী ইংরেজিতে বার্তাটি লিখে দেন। উপস্থিত ছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ, ড. মযহারুল ইসলামসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।
এদিকে চট্টগ্রামে তখনও টানটান উত্তেজনা। শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষুব্ধ জনতা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগঠিত করছিল। ২৬ মার্চ ভোর থেকেই চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর বার্তা নিয়ে মাঠে নামে। তারা মাইকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করতে শুরু করে। এতে জনগণের মনে জন্ম নেয় স্পষ্ট ধারণা-বাংলাদেশ স্বাধীন। চট্টগ্রাম শহরের প্রতিটি মোড়, বাজার, আবাসিক এলাকা এবং কারখানায় সেই বার্তা আশার আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে তখন ঘটছিল ইতিহাসের আরেক অধ্যায়। বেতারকর্মী, প্রকৌশলী, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং ছাত্রদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে যুদ্ধকালীন জরুরি সম্প্রচার ব্যবস্থা। বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, সৈয়দ আবদুস শাকের, আব্দুল্লাহ আল ফারুকসহ চট্টগ্রাম বেতারের আটজন কর্মী অকৃত্রিম সাহসিকতার সাথে বেতার কেন্দ্র সচল রাখেন। তাদের সঙ্গে বহিরাগত দুইজন প্রকৌশলী যুক্ত হয়ে একটি দল গঠন করেন। যুদ্ধের সময় বেতার কেন্দ্র ধরে রাখা ছিল জীবন বাজি রাখার শামিল, কারণ পাকিস্তানি সেনারা যে কোনও সময় সেখানে আক্রমণ করতে পারত।
২৬ মার্চ দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান প্রথমবারের মতো কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করেন। এটি ছিল স্বাধীনতার ঘোষণার প্রথম আনুষ্ঠানিক বাংলা পাঠ। সন্ধ্যায় ওয়াপদা প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম ইংরেজিতে একই ঘোষণা পাঠ করেন। এরপর আবুল কাশেম সন্দ্বীপ বাংলায় তার অনুবাদ পাঠ করে শোনান। বাংলায় অনুবাদে সহযোগিতা করেন ড. মঞ্জুলে মাওলা। এই তিন ধারার ঘোষণা যোগে দেশ বিদেশে ছড়িয়ে যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার খবর।
এরই মধ্যে সলিমপুর ও মগবাজার ওয়ারলেস স্টেশন ছিল বার্তা পাঠানোর আরেকটি মুখ্য কেন্দ্র। ঢাকার মগবাজার ওয়ারলেসের মেজবাহউদ্দিন ২৬ মার্চ রাতে স্বাধীনতার বার্তা সলিমপুরে পাঠান। সলিমপুর স্টেশনের জালাল আহমেদ, জুলহাস উদ্দিন, শফিকুল ইসলামসহ কর্মকর্তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি ভারতের ত্রিপুরা, আগরতলা ও কলকাতায় বার্তাটি পুনঃপ্রেরণ করেন। ফলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও দ্রুত জানতে পারে-বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুনির্দিষ্ট পথে হাঁটছে।
এদিকে আগ্রাবাদ রেডিও স্টেশনে ছাত্ররা ঘোষণা প্রচারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলে তারা দলে দলে কালুরঘাটে ছুটে আসে। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে একটি নিরাপদ সম্প্রচার কেন্দ্র তৈরি করা ছিল সময়ের দাবি। তবে বেতার কেন্দ্রে সামরিক নেতৃত্ব না থাকায় একটি শূন্যতা দেখা দেয়। সেই সময় ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম পরামর্শ দেন-মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ধরে রাখতে একজন সামরিক কর্মকর্তা দিয়ে ঘোষণা দেওয়াই উচিত। এরপর নিখোঁজ খোঁজাখুঁজির পর ষোলশহর থেকে মেজর জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করে আনা হয়। তিনি বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে সর্বোচ্চ পদমর্যাদার ছিলেন এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতার পক্ষে ঘোষণা পাঠ করতে সম্মত হন।
মেজর জিয়ার ঘোষণা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। তবে ইতিহাসবিদরা বারবার মনে করিয়ে দেন-এটি ছিল বঙ্গবন্ধুর পাঠানো ঘোষণার পুনঃপাঠ মাত্র। কারণ দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুই, এবং সকল প্রচারই সেই ঘোষণার ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও একই তথ্য তুলে ধরে। ২৭ মার্চ ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত “বাংলাদেশের বাণী” শীর্ষক প্রতিবেদন এবং ‘দ্য অবজারভার’-এর রিপোর্টে চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
তবে এসব প্রতিবেদনে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় তা মূলত দ্রুত বদলে যাওয়া যুদ্ধের পরিস্থিতি, সঠিক যোগাযোগব্যবস্থার অভাব এবং বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন ঘোষণার কারণে। কিন্তু অধিকাংশ গবেষকের সার্বিক মত-২৬ মার্চ রাতেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র সেই ঘোষণাকে জাতির কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে।
পাকিস্তানি বাহিনী তখন কালুরঘাটের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। বেতার কেন্দ্রের কর্মীরা জীবনবিপন্ন পরিস্থিতিতে একের পর এক ঘোষণা প্রচার করেন, কারণ জানা ছিল-যদি বেতার কেন্দ্র নীরব হয়ে যায়, জনগণের মনে ভয় ছড়িয়ে পড়বে। তাই নিজের পরিবার, জীবন, নিরাপত্তা সবকিছু ভুলে তারা দায়িত্ব পালন করেন। গণমানুষের কাছে আজও কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র প্রতিরোধের প্রতীক।
চট্টগ্রামে তখন সাধারণ মানুষ, ছাত্র, রাজনৈতিক নেতারা চারদিক থেকে ছুটে এসে বেতার কেন্দ্রের নিরাপত্তা রক্ষায় অংশ নেন। কেউ পাহারা দেন, কেউ প্রযুক্তিগত সহায়তা করেন, কেউ বার্তা সংগ্রহ-সম্পাদনায় যুক্ত হন। এক কথায় পুরো চট্টগ্রাম শহরই হয়ে ওঠে মুক্তিকামী মানুষের ঐক্যের প্রতীক।
সবশেষে পাকিস্তানি বাহিনী কালুরঘাটের দিকে অগ্রসর হওয়ায় বেতার কেন্দ্রটি সরিয়ে নেওয়া হয় এবং বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র অন্য স্থানে স্থাপন করা হয়। কিন্তু কালুরঘাটের যেসব মুহূর্তে বাংলাদেশ প্রথম স্বাধীনতার বার্তা প্রচার করে-সেগুলো আজও জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও গর্বের অধ্যায়।
চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র তাই কেবল একটি প্রচার কেন্দ্র নয়-এটি বাংলাদেশের জন্মক্ষণে উচ্চারিত প্রথম আলোর উৎস। এখানে মিশে আছে ত্যাগ, সাহস, প্রযুক্তি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে স্বদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার অপরিসীম প্রত্যয়।
