বরিশালের অবস্থান কোথায়: ভূমিকম্পে ঢাকার চেয়েও বেশি বিপদে যেসব অঞ্চল

0

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন-২০২৫ সালে বাড়ছে ভূকম্পনের ঝুঁকি

ভূমিকম্পে কোন অঞ্চল সবচেয়ে বিপদে? বাংলাদেশের নতুন ঝুঁকি মানচিত্র প্রকাশ

সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকা কেঁপে ওঠার পর পুরো দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ওই কম্পনের প্রভাব এখনো কাটেনি মানুষের মন থেকে। ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একাধিক আফটারশক অনুভূত হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা আরও উদ্বেগজনক ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তাদের মতে, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে এই মুহূর্তে টেকটোনিক চাপ (Tectonic Stress) অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নভেম্বর–ডিসেম্বরে আরও কয়েকটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অথবা ক্ষুদ্র কম্পন ঘটতে পারে।

বাংলাদেশের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী দেশটি তিনটি প্রধান ভূমিকম্প ঝুঁকি জোনে বিভক্ত-জোন-১ (উচ্চ ঝুঁকি), জোন-২ (মধ্যম ঝুঁকি) এবং জোন-৩ (নিম্ন ঝুঁকি)। এর মধ্যে ঢাকার চেয়ে বেশি ঝুঁকি বহন করছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পাহাড়ি অঞ্চলগুলো।

এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো-কোন অঞ্চল কতটা ঝুঁকিতে, কেন ঝুঁকিপূর্ণ, এবং ভূমিকম্প প্রস্তুতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ।


কেন বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ দেশ?

বাংলাদেশ তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত-

  1. ইন্ডিয়ান প্লেট

  2. ইউরেশিয়ান প্লেট

  3. বার্মা সাব-প্লেট

এই প্লেটগুলো একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ, ঘর্ষণ ও চাপ সৃষ্টি করে। ভূগর্ভে সঞ্চিত শক্তি সময়ভেদে ভূমিকম্প হিসেবে প্রকাশ পায়। ভূতাত্ত্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশ চারপাশে অন্তত পাঁচটি সক্রিয় ভূগর্ভস্থ ফল্ট দ্বারা বেষ্টিত, যা বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।


ঢাকার চেয়েও বেশি ভূমিকম্প-ঝুঁকিতে যেসব অঞ্চল

বাংলাদেশের জোন–১ অঞ্চলগুলোকে বলা হয় উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বা High Seismic Risk Zone। সাম্প্রতিক গবেষণা, স্যাটেলাইট ডেটা এবং সিসমিক অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্পে ঢাকার চেয়েও বেশি বিপদের মুখে আছে উত্তর–পূর্ব ও পূর্বাঞ্চল।

উচ্চ ঝুঁকিপ্রবণ অঞ্চল (জোন-১)

এখানে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি

এই জোনের জেলা ও এলাকা-

  • সিলেট

  • সুনামগঞ্জ

  • মৌলভীবাজার

  • হবিগঞ্জ

  • চট্টগ্রাম জেলার পাহাড়ি অংশ

  • রাঙামাটি

  • বান্দরবান

কেন এই অঞ্চলগুলো এত ঝুঁকিপূর্ণ?

✔ এগুলো সক্রিয় প্লেট বাউন্ডারি–২ ও ৩ এর খুব কাছে।
ডাউকি ফল্ট এই অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত-এটি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক ফল্টগুলোর একটি।
✔ ভারতীয় প্লেট ও মিয়ানমার সাব-প্লেটের সংঘর্ষজনিত চাপ এখানে দীর্ঘদিন ধরে জমা হচ্ছে।
✔ পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অতীতে ১৮৯৭, ১৯১৮, ১৯২৩ এবং ২৭০ বছরের রেকর্ডকৃত বড় ভূমিকম্প ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেট অঞ্চলে ৩০০ বছরের পুরোনো ভূ-চাপ জমে আছে, যা বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।


মাঝারি ঝুঁকির জোন-যেখানে পড়ে ঢাকা

মধ্যম ঝুঁকিপ্রবণ অঞ্চল (জোন-২)

এই জোনে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি তুলনামূলক কম হলেও ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি, বিশেষত যদি ভবন ও অবকাঠামো দুর্বল হয়।

জোন–২ এর প্রধান অঞ্চলগুলো-

  • ঢাকা মহানগর ও আশপাশ

  • টাঙ্গাইল

  • কুমিল্লা

  • নোয়াখালী

  • বগুড়া

  • রাজশাহী বিভাগের বড় অংশ

ঢাকা কেন মাঝারি ঝুঁকির এলাকায় থেকেও বেশি বিপজ্জনক?

✔ জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যধিক
✔ অপরিকল্পিত নগরায়ণ
✔ দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংখ্যা বেশি
✔ সরু রাস্তা ও উদ্ধারকাজের সীমাবদ্ধতা

ঢাকায় রিখটার স্কেলে ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও বিপুল ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে-এটি একাধিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।


সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল-জোন-৩

নিম্ন ঝুঁকিপ্রবণ অঞ্চল (জোন-৩)

এগুলো টেকটোনিক প্লেটের সক্রিয় অংশ থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করায় বড় ভূমিকম্পের সরাসরি আঘাতের সম্ভাবনা কম।

খুলনা বিভাগ

  • খুলনা

  • যশোর

  • সাতক্ষীরা

  • নড়াইল

  • মাগুরা

  • ঝিনাইদহ

  • কুষ্টিয়া

  • চুয়াডাঙ্গা

  • মেহেরপুর

বরিশাল বিভাগ

  • বরিশাল

  • পটুয়াখালী

  • ভোলা

  • পিরোজপুর

  • বরগুনা

  • ঝালকাঠি

রাজশাহী বিভাগের পশ্চিম অংশ

(তুলনামূলকভাবে নিরাপদ)

তবে কেন এখানে ঝুঁকি ০ নয়?

✔ দুর্বল ভবন
✔ অমানক নির্মাণসামগ্রী
✔ ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুতির অভাব

এসব কারণে নিম্নমাত্রার কম্পনেও ভবন ধসে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।


বাংলাদেশের পাঁচটি প্রধান ভূমিকম্প উৎস

ভূমিকম্প গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশ চারদিকে পাঁচটি সক্রিয় সিসমিক উৎস দ্বারা ঘিরে আছে-

১. প্লেট বাউন্ডারি–১

মিয়ানমার থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত বিস্তৃত।

২. প্লেট বাউন্ডারি–২

নোয়াখালী থেকে সিলেট।

৩. প্লেট বাউন্ডারি–৩

সিলেট হয়ে ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে প্রবেশ করেছে।

৪. ডাউকি ফল্ট

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট–সিলেট সীমান্ত দিয়ে বিস্তৃত।

৫. মধুপুর ফল্ট

ঢাকা–মধুপুর–তাঙ্গাইল অঞ্চলজুড়ে একটি সক্রিয় ভূমিকম্প উৎস।

এসব ফল্ট জোনে যত বেশি চাপ জমে, ততই বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা বাড়ে।


ভূমিকম্প নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

বাংলাদেশে ভবন নির্মাণে এখনও বিপুল পরিমাণ মানহীনতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে-

✔ দেশের ৪০–৫০% ভবন ভূমিকম্প সহনশীল নয়
✔ সরকারি প্রতিষ্ঠানেও সঠিক সিসমিক স্ট্যান্ডার্ড মানা হয়নি
✔ অতিতে বড় ভূমিকম্প হওয়ার পর দীর্ঘদিন শান্ত থাকার সময়টাই সবচেয়ে বিপজ্জনক

এ কারণে তারা মনে করেন-
বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্প ‘হওয়া সময়ের ব্যাপার’, কিন্তু কখন হবে তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)