সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি রুখবো, কিন্তু সাংবাদিককে অপমান নয়!

0

সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি রোধে পেশাদারদের মতবিনিময়

বরিশাল প্রতিনিধি ॥

বরিশালে সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি, দালালি ও অপসাংবাদিকতা বন্ধে পেশাদার সংবাদকর্মীদের অংশগ্রহণে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (২ নভেম্বর) বিকাল ৪টায় বরিশাল সদর রোডের কিং ফিসার রেস্তোরাঁয় অনুষ্ঠিত এই সভায় স্থানীয় প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ার সম্পাদক, প্রকাশক এবং বিভিন্ন পেশাদার সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

দেশের ৩৫টি সাংবাদিক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সভার মূল প্রতিপাদ্য ছিল-“সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা জোরদার করা এবং চাঁদাবাজি-দালালচক্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নেওয়া।”

সাংবাদিকতার পবিত্রতা রক্ষায় আত্মশুদ্ধির আহ্বান

সভায় সভাপতিত্ব করেন সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদক পরিষদের সমন্বয়ক মাহবুব রেজা। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম, দ্য ডেইলি বরিশাল টাইমসের সম্পাদক কামরুল আহসান সুমন, বরিশাল টেলিভিশন জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ আলম প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়-এটি সমাজের নৈতিক দিকনির্দেশনার অন্যতম মাধ্যম। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি ‘সাংবাদিক’ পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দালালি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করছে, যা সাংবাদিকতার ভাবমূর্তি নষ্ট করছে এবং প্রকৃত সংবাদকর্মীদের সম্মান ক্ষুণ্ণ করছে।

রফিকুল ইসলাম বলেন, “কিছু ভুয়া সাংবাদিকের কারণে আজ পুরো পেশাটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। অথচ সাংবাদিকতা হচ্ছে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ-এর মর্যাদা রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।”

সভায় বক্তারা আত্মশুদ্ধি ও নীতিনিষ্ঠা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে-প্রত্যেক সাংবাদিক সংগঠন নিজেদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ ও স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করবে, যাতে কেউ সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে না পারে।

সাংবাদিকতা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ; কলমের মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতিতে বরিশালে মতবিনিময়।

সাংবাদিক পরিচয় যাচাই ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব

সভায় গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়, সাংবাদিকদের পেশাগত পরিচয় যাচাইয়ে কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। প্রকৃত সংবাদকর্মী ও পেশার বাইরের ভুয়া পরিচয়ধারীদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি না হলে গণমাধ্যম খাত আরও অবিশ্বাসের মুখে পড়বে।

এছাড়া প্রস্তাবে সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মশালা, নৈতিকতা উন্নয়ন কোর্স এবং গণমাধ্যমে স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা প্রবর্তনের আহ্বান জানানো হয়।

একইসঙ্গে প্রস্তাব করা হয়-ভুয়া ও অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি যারা সাংবাদিকতার মানহানি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

“অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধ কমিটি”-নাকি ভয় দেখানোর হাতিয়ার?

সভায় আলোচনায় উঠে আসে সাম্প্রতিক এক বিতর্কিত উদ্যোগের বিষয়, যার নাম দেওয়া হয়েছে “অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধ কমিটি।”
বক্তারা বলেন, নামটি শুনলে মনে হয় যেন সাংবাদিকতা রক্ষার একটি মহৎ উদ্যোগ, কিন্তু বাস্তবে এটি অনেকাংশে আইনের সীমার বাইরে গঠিত একটি অননুমোদিত দমনযন্ত্রে পরিণত হচ্ছে।

তারা প্রশ্ন তোলেন-এই কমিটির আইনি ভিত্তি কোথায়? এটি কি তথ্য মন্ত্রণালয় বা প্রেস কাউন্সিলের অনুমোদিত সংস্থা? যদি না হয়, তাহলে সাংবাদিকদের তলব, জেরা বা সামাজিক মাধ্যমে অপমান করা সংবিধান ও দণ্ডবিধি অনুযায়ী অপরাধ বলে গণ্য হবে।

আইনের চোখে অপরাধ

বক্তারা স্মরণ করিয়ে দেন-বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(১) ও ৩৯(২) অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের মতপ্রকাশ ও চিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই কোনো সাংবাদিক সত্য প্রকাশ করলে তাকে ভয় দেখানো, তলব করা বা হেনস্তা করা সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন।

বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪ অনুসারে, সাংবাদিকতার আচরণ বা নৈতিকতা সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তের একমাত্র বৈধ প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল
সুতরাং কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন সাংবাদিককে জেরা বা শাস্তি দিতে পারে না।

আইন অনুযায়ী, সাংবাদিকদের হুমকি বা অপমান করলে নিচের ধারাগুলোতে অপরাধ গঠন হয়—

দণ্ডবিধি ধারা ৫০৬: ভয় প্রদর্শন

ধারা ৫০০–৫০১: মানহানি

ধারা ৫০৯: ইচ্ছাকৃত অপমান

ধারা ৩৪: যৌথ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড

এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও বিরুদ্ধে “ফেক একশন কমিটি”র নামে ভিডিও, পোস্ট বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচার করলেও সাইবার সিকিউরিটি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

আইনি করণীয়: ভয়ের পরিবর্তে পদক্ষেপ

সভায় বক্তারা পরামর্শ দেন, যারা এমন দমনমূলক কমিটির টার্গেটে পড়েছেন, তারা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা এফআইআর করতে পারেন। এছাড়া ভয় প্রদর্শন বা অপমানের ধারায় মামলা করার আইনি সুযোগও রয়েছে।

এছাড়া প্রেস কাউন্সিল ও তথ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা এবং প্রয়োজনে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে রিট আবেদন করারও আহ্বান জানানো হয়, যাতে সাংবাদিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা পায়।

দুই ধারার বিপদ

সভায় উপস্থিত অনেকেই বলেন, বর্তমানে সাংবাদিক সমাজ দুটি বিপদের মুখে-একদিকে ভুয়া সাংবাদিকদের চাঁদাবাজি, অন্যদিকে কিছু তথাকথিত সিন্ডিকেটের নাম করে সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর প্রবণতা।
“প্রথমরা সাংবাদিকতার নাম কলঙ্কিত করছে, আর দ্বিতীয়রা স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করছে”-বলেন দৈনিক দক্ষিণাঞ্চলের সম্পাদক ফজলুল বারী।

তিনি আরও বলেন, “আইন আছে, প্রেস কাউন্সিল আছে। কিন্তু কেউ নিজের হাতে আইন তুলে নিলে সেটা আর সাংবাদিকতা থাকে না, সেটা হয় দমননীতি।”

স্বাধীন সাংবাদিকতার শপথ

সভা শেষে সাংবাদিকরা একমত হন-“চাঁদাবাজি রোধ করতে হবে, কিন্তু সাংবাদিকতার স্বাধীনতা গিলে ফেলা যাবে না।”
তারা ঘোষণা দেন-আইন ও নৈতিকতার কাঠামোর মধ্যে থেকেই সাংবাদিক সমাজ নিজের ভুল সংশোধন করবে, কিন্তু কোনো অবৈধ কমিটি বা গোষ্ঠীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে না।

সভা শেষে বক্তারা বলেন, সাংবাদিকতা কোনো ভিক্ষা নয়-এটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। জনগণের আস্থা রক্ষা করাই সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি। তাই সাংবাদিকের কলম ভাঙার চেষ্টা মানে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা।

“আজ যারা অন্যের কলম ভাঙতে চায়, আগামীকাল তারাই জনগণের রোষে নিজেদের মুখ লুকাতে বাধ্য হবে”-এভাবেই সভার শেষ প্রস্তাবে উচ্চারিত হয় দৃঢ় বার্তা।

  • Older

    সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি রুখবো, কিন্তু সাংবাদিককে অপমান নয়!

Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)