খালেদা খানম পুতুল: গণতন্ত্রের মানসকণ্যা-মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী নারী নেতা

0
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান। তাঁর জীবন ও নেতৃত্বের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া: সংগ্রাম, ক্ষমতা ও বিতর্কের দীর্ঘ ইতিহাস

শোকবার্তা ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও আলোচিত নেত্রী, প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং তিনবারের সরকারপ্রধান বেগম খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থতায় ভোগা এই নেত্রীর মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাজনৈতিক বিভাজন সত্ত্বেও বহু নাগরিক তাঁর ভূমিকা স্মরণ করছেন একজন এমন নেত্রী হিসেবে, যিনি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নারী নেতৃত্বের ধারণাকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন।


সাধারণ গৃহিণী থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ছিল ব্যতিক্রমী। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম পুতুলের জীবনের শুরুটা ছিল সম্পূর্ণ ঘরোয়া। রাজনীতির সঙ্গে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল না। স্বামী জিয়াউর রহমান তখন সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা, পরে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে পরিচিতি পান।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়ার সামনে দুটি পথ খোলা ছিল-নীরব গৃহজীবনে ফিরে যাওয়া অথবা রাজনৈতিক সংগ্রামের ভার গ্রহণ করা। তিনি দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন, যা তাঁকে পরবর্তী চার দশকের জন্য বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসে।



সেনাশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মুখ

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশ আবারও সামরিক শাসনের অস্থিরতার মধ্যে পড়ে। সেই সময় রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি দ্রুতই সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দক্ষতা ছিল-বিভিন্ন আদর্শের রাজনৈতিক শক্তিকে একটি যৌথ লক্ষ্যে একত্রিত করা। মধ্য-ডানপন্থি বিএনপি হয়েও তিনি বামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলেন, যা শেষ পর্যন্ত এরশাদ সরকারের স্বৈরশাসন দুর্বল করে দেয়।


গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ও ১৯৯১ সালের নির্বাচন

১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল একটি বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক নির্বাচন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে।

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আন্তর্জাতিক মহলে এই ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ায় গণতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।


তিন মেয়াদের শাসন: সংকট ও স্থিতিশীলতার দ্বন্দ্ব

খালেদা জিয়া মোট তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন-১৯৯১ থেকে ১৯৯৬, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বল্প মেয়াদে এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত। এই সময়গুলোতে তিনি রাজনৈতিক সংকট, সংসদীয় অচলাবস্থা, বিরোধী আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখোমুখি হয়েছেন।

তাঁর সমর্থকদের মতে, তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রকে সচল রাখতে এবং বিরোধী রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক সংঘাত নিরসনে তাঁর সরকার আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত।


নারীর ক্ষমতায়নে কাঠামোগত পরিবর্তন

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো নারীর ক্ষমতায়নে তাঁর অবদান। তাঁর সরকারের সময় মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা, বিশেষ বৃত্তি, এবং স্কুলে উপস্থিতি বাড়ানোর কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়।

রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণেও তাঁর সরকারের নীতিগত সহায়তা নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। আজ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নারীদের যে দৃশ্যমান উপস্থিতি, তার পেছনে এই সময়ের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।



আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বৈশ্বিক মূল্যায়ন

১৯৯৩ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে নারী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে খালেদা জিয়ার প্রশংসা করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তিনি শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণকে উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন।

২০০১-২০০৬ মেয়াদে একাধিক বছর ফোর্বস ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাসীন নারীর তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়, যা তাঁর বৈশ্বিক রাজনৈতিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।


‘ব্যাটলিং বেগমস’: প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনীতি

খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার সম্পর্ক ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। পশ্চিমা কূটনীতিকরা এই দ্বন্দ্বকে আখ্যা দেন “Battling Begums” নামে।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা একদিকে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ালেও অন্যদিকে সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে-যার প্রভাব এখনো দৃশ্যমান।


বিরোধী রাজনীতির প্রতীক

ক্ষমতায় না থাকাকালেও খালেদা জিয়া ছিলেন বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রীয় মুখ। সংসদের বাইরে আন্দোলন, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা এবং ভোটাধিকারের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান বহুবার দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করেছে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, শক্তিশালী বিরোধী নেতৃত্ব ছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতি একপাক্ষিক হয়ে পড়ত-সেই ভারসাম্য রক্ষায় তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।



ব্যক্তিজীবন ও পারিবারিক উত্তরাধিকার

খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। কনিষ্ঠ ছেলে আরাফাত রহমান কোকো আগেই ইন্তেকাল করেছেন। নাতনি জাইমা রহমান ও জাহিয়া রহমান রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় রয়েছেন।

পরিবারটি এখনও বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বহন করে।


বিতর্ক, সমালোচনা ও ইতিহাসের রায়

খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিতর্ক ও সমালোচনা ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমর্থকরা তাঁকে গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে দেখলেও সমালোচকরা তাঁর শাসনামলের দুর্বলতা তুলে ধরেন।

তবে ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর ভূমিকা বিচার হবে দীর্ঘমেয়াদে-গণতন্ত্র, নারী নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যে তাঁর অবদান বিবেচনায় রেখে।


এক মহাকাব্যের অবসান

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগের সমাপ্তি নির্দেশ করে। তিনি ছিলেন এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা সামরিক শাসন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে নেতৃত্ব গড়ে তুলেছেন।


ইতিহাসে খালেদা জিয়ার স্থান

বাংলাদেশের ইতিহাসে খালেদা জিয়া থাকবেন-
গৃহিণী থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠা এক বিরল রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে,
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে, গণতন্ত্রের প্রশ্নে একমাত্র আপোষহীন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নারী নেতৃত্বের পথপ্রদর্শক হিসেবে।

Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)